Friday, August 7, 2009

চুল যখন ঝরে

স্বাস্থজ্জ্বল সুন্দর চুল আমরা সবাই চাই। নানা রকম দুষন, মানসিকচাপ, অনিয়মিত খাদ্যগ্রহণ এবং অনিয়ন্দ্রিত জীবন যাপন, নানারকম অসুখ কিংবা ব্যক্তিগত কারনে বর্তমানে অনেক অনাবয়সীরই চুল ঝরে যাচ্ছে। চুল ঝরে যাচ্ছে কিংবা টাক সমস্যা নিয়ে যারা ব্যথা বলেন তারা নিচের সমস্যাগুলোর ব্যথা সাধারণত বলে থাকেন।

  • চুলের গোড়ায় ময়লা জমে।
  • ১ দিন চুল শ্যাম্পু না করলে তেল তেল ভাব হয়।
  • মাথা চুলকায়।
  • চুলের গোড়ায় ছোট ছোট গোটা এবং ব্যথা হয়।
  • সাদা আদা খুশকির গুড়া দেখা যায়।
  • চুলের আগা দ্বিখন্তিত হয়ে যায়।
  • চুলে রম্নস্ন ভাব থাকে।
  • চুল লালচে হয়ে যাচ্ছে।
  • চুলের গোড়ায় ব্যথা হয়।
এধরনের সমস্যার কারণগুলো হচ্ছে-
  • চুল ঠিকমত পরিস্কার না রাখা।
  • ছত্রাকের আক্রমন টিনিয়া কেপিটিস
  • অগমিনেট ফলিকুলাইটিস
  • খুশকির আক্রমন
  • ডিটামিনের অভাব
  • রক্ত স্বল্পতা
  • চুলের সঠিক যত্ন না হওয়া
  • নানা রকম কেমিকেলের ব্যবহার
  • হরমোনের তারতম্য
  • সেবোরিক ডার্ম টাইটিস
  • এন্ড্রোজেনিক এলোপিমিয়া বা বংশগত
চুলের সঠিক যত্ন ও পুষ্টির অভাবে চুল পড়ে যায়। খুব সাধারণ নিয়মে চুলের কিছু যত্ন করলে চুল ভালো থাকে। ১ দিন অন্তর চুল পরিস্কার করা প্রয়োজন। ভেজা চুল আচড়ানো ঠিক নয়। অতিরিক্ত আচড়ানোও ঠিক নয়। খাদ্যভাস এখানে একটি বড় ব্যাপার ফল, শাক সবজি, ডিম, দুধ নিয়মিত খাওয়া প্রয়োজন।

চুল প্রোটিন দিয়ে তৈরী। তাই খাদ্যতালিকায় প্রোটিন রাখা প্রয়োজন। ওজন কমানোর জন্য ডায়েটিং করার সময়ও এ ব্যাপারে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় ক্যালমিয়াম, আয়রন ও অন্যান্য ভিটামিন খাওয়া হচ্ছে কিনা লক্ষ্য রাখুন। কিছু ঔষুধ দীর্ঘদিন সেবনের ফলেও চুল ঝরতে পারে। যেমন গাউট কিংবা আর্থারাইটিসের ঔষধ মানসিক অবসাদের ঔষধ, এছাড়া ক্যান্সার কেমোসেরাপি। ঝরে পড়া স্বাভাবিক। কিন্ত্ত এর থেকে বেশি মনে হলে সর্তক হন। বর্তমানে চুল পড়ার আধুনিক চিকিৎসা আছে। কম বয়সে চুল পড়লে অবশ্যই চিকিৎসা প্রয়োজন কারনে এতে চুল ঝরা অন্তত বন্ধ হবে। মনে রাখতে হবে চুল ঝরা বন্ধ হলে আপনার মাথায় ঠাক পড়বে না। আর নতুন চুল গজানোর জন্যও একটু ঔষধ ব্যবহার করা হচ্ছে। কিনাষ্টেররেও নামের উষধ ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করতে হয়। চুল ঝড়তে শুরম্ন করলে অবহেলা না করে সঠিক চিকিৎসা যত্ন নিন।

ডা. ওয়ানাইজা
চেম্বার : জেনারেল মেডিক্যাল হাসপাতাল (প্রা.) লি. ১০৩, এলিফ্যান্ট রোড (তৃতীয় তলা), বাটা সিগন্যালের পশ্চিম দিকে, ঢাকা। মোবাইল : ০১৯১১৫৬৬৮৪২।


সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক, আগস্ট-২০০৯

পাকস্থলীর ক্যান্সার

যে সব ক্যান্সারের কারণে মানুষ মারা যায় তন্মধ্যে পাকস্থলীর ক্যান্সার অন্যতম। তবে আশার কথা হল এই যে- এ রোগটি প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয় করা গেলে এবং অপারেশনের মাধ্যমে ক্যান্সারের আক্রান্ত স্থান ফেলে দিলে রোগী সম্পূর্ণ রূপে ভাল থাকতে পারেন।

প্রাথমিক অবস্থায় হজম ক্রিয়ার গোলযোগ বা সচরাচর খাদ্য গ্রহণের পাকাশয়ের প্রান্তভাগে অস্বস্তি অনুভুতি বা Dyspepsia ছাড়া তেমন কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। এর ফলে রোগী তেমন কোনো গুরুত্ব দেন না, অনেকে মনে করেন গ্যাষ্ট্রিক হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ খেয়ে অনেকে সাময়িক আরাম অনুভব করেন। ফলে ক্যান্সার পাকস্থলী থেকে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। রোগটি ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা যায়-

  • অল্প খেলেই তৃপ্তি চলে আসে;
  • পেট ফেপে থাকে;
  • পেট ফুলে যায়;
  • বমি হয়;
  • রক্ত শূণ্যতা দেখা যায়;
  • খাদ্য গ্রহনে অন্ননালীতে ব্যথা অনুভব হয়;
  • শরীরের ওজন কমে যায়;
  • বমির সাথে রক্ত যায় কিংবা কালো পায়খানা হতে পারে।
যে ক্ষেত্রে অপারেশন করিয়েও রোগীর আয়ুষ্কাল খুব বেশী বাড়ানো যায় না। এ রোগটি সাধারণত চল্লিশোর্ধ বয়সেই বেশী হয়ে থাকে। নারীদের চেয়ে পুরম্নষেরা এ রোগে বেশী আক্রান্ত হন। যে সমস্ত কারণে পাকস্থলীতে ক্যান্সার হয় তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-
  • হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি নামক এক প্রকার জীবাণুর আক্রমন;
  • প্রচুর পরিমানে মদ্যপান;
  • যে সমস্ত খাবারে অত্যাধিক লবণ রয়েছে যেমনঃ কিছু কিছু সামুদ্রিক মাছ, দীর্ঘ দিন যাবৎ সংরক্ষিত টিনজাত খাবার;
  • যে সমস্ত খাবারে N-nitrous compounds রয়েছে কিংবা এন্টি অক্সিডেন্ট এর অভাব রয়েছে।
ধুমপায়ী লোক এবং যে পরিবেশে ডাস্ট বা ধূলাবালী বেশী সেখানে বসবাসকারীদের মধ্যে এ রোগ হতে পারে। কেউ কেউ মনে করে বংশগত কারণেও পাকস্থলীর ক্যান্সার হতে পারে।

পূর্বে জাপানে পাকস্থলী ক্যান্সারের কারণে বহুলোক মারা যেত। কিন্তু বর্তমানে চলিশোর্ধ বয়সের যে লোক হজম ক্রিয়ার গোলযোগে আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে এন্ডোস্কোপি করে প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় করে ক্যান্সার অপারেশনের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয় এবং রোগী বাকী জীবন যাপন করতে পারেন।

কিন্তু আমাদের দেশে রোগীরা যখন ডাক্তারের শরনাপন্ন হন- তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্যান্সার পাকস্থলীর বাইরে ছড়িয়ে পরে। প্রাথমিক অবস্থায় পাকস্থলীর ক্যান্সার নির্ণয় করা গেলে অপারেশনের মাধ্যমে এ রোগ থেকে সম্পূর্ণ নিরাময় হওয়া যায়।

অধ্যাপক ডা. একেএম ফজলুল হক
বৃহদন্ত্র ও পায়ূপথ বিশেষজ্ঞ

চেম্বারঃ জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশীপ হাসপাতাল, ৫৫, সাত মসজিদ রোড, ধানমণ্ডি, ঢাকা। ফোনঃ ০১৭১৫-০৮৭৬৬১, ০১৭২৬-৭০৩১১৬।

দৈনিক ইত্তেফাক- আগস্ট, ২০০৯

হৃদরোগীদের খাবার দাবার

সুপার-পোষক সমূহ বর্তমানে মেডিক্যাল আর বৈজ্ঞানিক রিসার্চের মনোযোগ আকৃষ্ট করেছে। এগুলো হচ্ছে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি আর ভিটামিন-ই-র অগ্রদূত। এই সব পোষক এক সাথে মিলে এমন শক্তিশালী জোট তৈরী করে, যেটা শরীরকে বেশ কিছু রোগের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে আর বয়স বাড়ার ক্রিয়াকেও কম করতে পারে।

এই সব ভিটামিন বেশ কয়েক ধরনের খাদ্য পদার্থে পাওয়া যায় আর প্রাকৃতিক রূপে ফল আর সব্জীর মধ্যে পাওয়া যায়, যেগুলো আমরা বেশী পরিমাণে খেতে পারিঃ বিশেষ করে যখন সেগুলোর মরশুম থাকে। অন্য দিকে ওষুধ খেলে তার সাইড এফেক্টস হতে পারে আর প্রাকৃতিক পোষকগুলোর সঙ্গে এর কোন মিলই নেই। আসলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংগঠন আর অন্য খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রাণালয়গুলোর সমর্থনে এই দিকে যথেষ্ট অনুসন্ধান চালানো হয়েছে।

বিটা-ক্যারোটিন, ভিটামিন-সি আর ভিটামিন-ই-র অদ্ভুত শক্তির ব্যাপারে প্রচুর অধ্যয়ন করা হয়েছে। স্বাধীন ভাবে ভিটামিন-এ ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই সেবন করা ব্যক্তিদের মধ্যে ক্যান্সার, এ্যাঞ্জাইনা আর হৃদয় রোগ কম দেখতে পাওয়া যায় আর তাদের আয়ুও লম্বা হয়।

শরীরকে চালানোর জন্য ভোজন থেকে প্রাপ্ত অক্সিজেনের সঞ্চার হিমোগ্লোবিনের লাল রং-য়ের কণাগুলো দ্বারা হয়, যাতে লৌহ থাকে। রক্ত-প্রবাহে অক্সিজেন কোশিকাগুলোকে জীবিত রাখার জন্য গ্রহণ করা হয়। এই ক্রিয়াকে অক্সিডেশন বলা হয়। যদিও এই অক্সিজেন মুক্ত কণার নির্মাণও করে, যেটা অধিক পরিমাণে হয়ে পড়লে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

মুক্ত কণা অক্সিডেশনের ক্রিয়ার সময় সৃষ্টি হয়। যখন শরীর অক্সিজেনের ব্যবহার করে, তখন সেটা এনার্জি তৈরী করার জন্য ভোজনকে বিঘটিত করে। এটা কীটানু, ওজোন আর কর্বন মোনো-অক্সাইডের মত বিষাক্ত তত্ত্বগুলোকেও নষ্ট করে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় মুক্ত কণাও সৃষ্টি হয় এই সব কণা কোশিকাগুলোর ঝিল্লীকে নষ্ট করে দেয় আর ক্রোমোসোন্স এবং জৈবীয় সামগ্রীগুলোর ক্ষতিসাধন করে। এটা মুল্যবান এঞ্জাইমগুলোকেও নষ্ট করে ফেলে, যার কারণে পুরো শরীরে নষ্ট হয়ে পড়ার এক প্রতিক্রিয়া শুরম্ন হয়ে পরে। এই ভাবে মুক্ত কণা করোনারী হৃদয় রোগ, ফসফুসের রোগ, কয়েক ধরনের ক্যান্সার, চোখের ছানি, আর্থারাইটিস, পার্কংসন্স রোগ আর বার্ধক্যের মত কমপক্ষে ৫০ শতাংশ রোগের এক বড় কারণ হয়ে ওঠে।

মুক্ত কণা থেকে হওয়া ক্ষতিকে আমরা দু ভাবে কম করতে পারি। প্রথম, আমাদের এমন তত্ত্ব আর গতিবিধির হাত থেকে বাচতে হবে, যেগুলো মুক্ত কণা সৃষ্টি হতে সহায়তা করে, যেমন-সিগারেট, প্রদুষণ আর সুর্যের আল্ট্রাভায়োলেট কিরণ।

দ্বিতীয়তঃ এটা সুনিশ্চিত করতে হবে যে, আমরা নিজেদের দৈনিক আহারে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি আর মিটামিন-ই সেবন করে, বেশী মাত্রায় এ্যান্টী-অক্সিডেন্ট গ্রহণ করব।

যদিও ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি আর ভিটামিন-ই মুক্ত কণা থেকে হওয়া ক্ষতির সঙ্গে লড়তে সহায়তা করে, বায়ু প্রদুষনও এই সব গুরম্নত্বপূর্ণ পোষকগুলোর সাপ্লাইকে কম করে তোলে। অধ্যয়ন থেকে এটা জানতে পারা গেছে যে, শহরে বাস করা ব্যক্তিদের মধ্যে, যারা প্রদুষিত হাওয়ায় শ্বাস নেন, এ্যান্টি-অক্সিডেন্টের স্তর কম থাকে। এর ফলে শরীরে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি আর ভিটামিন-ই-র আপুর্তি বিপজ্জনক ভাবে কমে আসে। এমনটা হলে এগুলোর জায়গা মুক্ত কনা নিয়ে আর অক্সিডেটিভ চাপয়ের সৃষ্টি হয়ে পড়ে। আমাদের ভোজনে মুক্ত কণা থাকাটা আমাদের পক্ষে বিপজ্জনক হয়। এর মুখ্য উৎস হচ্ছে ফ্যাট (যেমন বেশী তাপমাত্রায় গরম করা রান্না করার তেল) ফ্যাটকে যে মুহুর্তে গরম করা হয়, তার রাসায়নিক রচনা ভেঙে বিপজ্জনক হাইড্রোক্সিল কণা তৈরী করে। কোশিকাগুলোর আর ডিএনএয়ের প্রচণ্ড ক্ষতি করে। (সুর্যমুখীর তেলের মত পোলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশী তাপমাত্রায় কম স্থায়ী থাকে। এটা জৈতুনের তেলের মত মোনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট-য়ের তুলনায় দ্রম্নত অক্সিডেটেড হয়ে পড়ে।) মেডিক্যাল সায়েন্স সর্বদা ভিটামিনের লাভের প্রচার করে এসেছে আর বৈজ্ঞানিকেরাও এই জাদু তত্ত্বের সার্থকতা প্রমানিত করার জন্য কঠোর প্ররিশ্রম করেছেন। এ্যান্টী-অক্সিডেন্টসের বিচার সম্বন্ধিত রূপে কিছুটা নতুন।

এ্যান্টী-অক্সিডেন্টস প্যাথোলোজিক্যাল পরিস্থিতি গুলোয় চিকিৎসায় নতুন পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে যেমনঃ

০ কার্ডিয়োভাস্কুলার রোগ- সিএইচডি, উচ্চ রক্তচাপ।

০ সেরিব্রোভাস্কুলার রোগ।

০ মেটাবোলিজম রোগ-ডায়াবেটিজ মেলিটাস।

০ শিরার রোগ- এলে&জমিট রোগ, মৃগী।

০ বিপোষক রোগ- চোখের ছানি, আর্থারাইটিস, বার্ধযক্য।

০ ক্যান্সার।

ভিটামিন-এ

ভিটামিন-এ দু প্রকারের হয়। প্রথম, পশুদের থেকে প্রাপ্ত উৎপাদন, যেমন মাংস আর দুধে পাওয়া যায়। একে রেটিনল বলা হয়; এবং দ্বিতীয় ফল আর সব্জীতে পাওয়া যায়, যাকে- ক্যারেটিন’ বলা হয়। বিটা-ক্যারেটিনই এ্যান্টী- অক্সিডেন্টের রূপে কাজ করে।

শরীরের বিকাশ আর তন্ত্রগুলোকে সুস্থ রাখার জন্য ভিটামিন-‘এ’-র প্রয়োজন হয়। এর অভাব হয়ে পড়লে ত্বক আর চোখ অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে আর সুস্থ হাড় আর ভালো দাঁত তৈরী হতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। যদি এর অভাবের চিকিৎসা সময় থাকতে না করানো হয়, তাহলে ব্যক্তি পুরোপুরি অন্ধ ও হয়ে পড়তে পারেন। ভারতে অন্ধত্বের কারণগুলোর মধ্যে সব থেকে সাধারণ কারণ হচ্ছে ভিটামিন- ‘এ’-র অভাব। বিটা- ক্যারোটিন বেশ কিছু ফল আর সব্জীতে পাওয়া যায়, যেমন- পালং শাক, ধনেপাতা, বাঁধাকপি, গাজর, আম, টমাটো ইত্যাদি। শরীরে এই ক্যারোটিন, ভিটামিন- ‘এ’তে পরিবর্তিত হয়ে পড়ে। বিটা- ক্যারোটিন রান্না করলে বা আল্ট্রা-ভায়োলেট কিরণের ফলে নষ্ট হয় না।

একজন বয়স্ক ব্যক্তির প্রতি দিন ৬০০ মিলি গ্রাম রেটিনল বা ২৪ মিলিগ্রাম বিটা-ক্যারোটিন-য়ের প্রয়োজন হয়। বাড়ন্ত বাচ্চা, গর্ভবতী মহিলা আর অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই প্রয়োজনটা আরও বেশী হয়। ১ মিলিগ্রাম বিটা-ক্যারোটিন= ০.২৫ মিলিগ্রাম রেটিনল।

বিটা-ক্যারোটিন দু ভাবে কাজ করে। প্রথমে এর কিছু অংশ ভিটামিন-এ তে পরিবর্তিত হয় আর অবশিষ্ট বিটা-ক্যারটিন এ্যান্টী-অক্সিডেন্টের রƒপে কাজ করে। এটা অত্যন্ত গুরম্নত্বপূর্ণ যে, বিটা-ক্যারোটিন আর ভিটামিন-এ-র মধ্যে যেন ভ্রমের সৃষ্টি না হয়ে পড়ে, কারন এই দুটো হচ্ছে আলাদা- আলাদা তত্ত্ব। আমাদের শরীর বিটা-ক্যারোটিনকে ভিটামিন-এ-তে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়।

যদিও, দীর্ঘ সময় ধরে বেশী পরিমাণে ভিটামিন-এ সেবন করাটা ক্ষতিকারক লক্ষন সৃষ্টি করতে পারে, যেমন- মাথা যন্ত্রণা, গা গোলানো, বমি, আলস্য, শুষ্ক ত্বক, ঠোঁট ফাটা ইত্যাদি।

ভিটামিন-এ-র প্রয়োজন শরীরের বিকাশ আর তার তন্ত্তগুলোকে সুস্থ রাখার জন্য হয়। এর গুরম্নত্বপূর্ন ভূমিকাগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে আমাদের কোশিকাগুলোকে স্বরক্ষাত্মক কবচ বা ঝিল্লি প্রদান করা। এটা মিউকাস ঝিল্লি-কেও সুরক্ষিত রাখে। এটা ফ্যাটে গুলো যায়। মাছের লিভারের তেল হচ্ছে ভিটামিন-এ-র সব থেকে ভালো প্রাকৃতিক উৎস।

বিটা-ক্যারোটিন হচ্ছে গাছের মধ্যে পাওয়া এক প্রাকৃতিক পদার্থ আর সবার আগে এটাকে গাজরের মধ্যে খুজে পাওয়া গেছিল.. এজন্য পুরো পরিবারকে ক্যারোটেনয়েডস& নাম প্রদান করা হয়েছিল। ক্রারোটেনয়েডস& নাম প্রদান করা হয়েছিল। ক্রারোটেনয়েডস& বেশ কিছু রঙ্গীন পদার্থ রয়েছে, যেগুলো প্রকৃতিতে দেখতে পাওয়া বেশ কিছু রং-য়ের ভাণ্ডার। বিটা-ক্যারোটিন গাঢ় লাল-কমলা রং-য়ের হয় এবং হলুদ আর কমলা গাঢ় সবুজ রংয়ের সব্জীতেও ক্যারোটিন থাকে, কিন্ত্ত ক্লোরোফিলের কারণে হলুদ আর কমলা রং চাপা পড়ে যায়.. কিন্ত্ত অনেকবার এটা বেশী চাপা পড়তে পারে না .. যেমন লাউতে।

বিটা-ক্যারোটিন হচ্ছে সব থেকে শক্তিশালী এ্যান্টী-অক্সিডেন্টসগুলোর অন্যতম, যেটা গাছকে সূর্যের আল্টা-ভায়োলেট কিরণে পুড়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। এটা হচ্ছে প্রকৃতির সঠিক রক্ষক। তরমুজ, বেদানা, আডু, আম আর গাজর, আলু, পালং শাক, টমাটো, আজওয়াইন, জলকুম্ভী আর ফুলকপির মত ফল আর সব্জীতে বিটা-ক্যারোটিন থাকে।

ভিটামিন-সি (এস্কোর্বিক এ্যাসিড)

এ্যান্টি- অক্সিডেন্টের রƒপে কাজ করা ছাড়াও ভিটামিন-সি-র আরও বেশ কিছু গুণ রয়েছে। এটা শরীরের বিকাশ আর শরীরের তন্ত্তগুলো, মাড়ি, দাত, রক্তের নাড়ি আর হাড়ে হয়ে পড়া ক্ষতিকে পুরণ করতেও সহায়তা করে। এটা শারীরিক ব্যবস্থায় শামিল থেকে ব্যাক্টেরিয়া আর ভাইরাল সংক্রমণয়ের সঙ্গে লড়তেও সহায়তা করে। ভিটামিন-সি-র অভাবের কারণে হেমারেজ ক্ষতস্থান শুকোতে সময় নেওয়া, স্কার্বি রোগ, মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, হাড়ের ধীর গতিতে নির্মান ইত্যাদি লক্ষন দেখতে পাওয়া যায়। ভিটামিন-সি আমলাতে পাওয়া যায়। ভিটামিন-সি-র ভালো উৎস হচ্ছে রসযুক্ত ফল, যেমন- পাতি লেবু, মুসম্বী লেবু, কমলা লেবু, পেয়ারা আর সবুজ পাতাওয়ালা সব্জী, যেমন- পালং শাক ইত্যাদি। কাটা আর রান্না একে নষ্ট করে দেয়। একজন বয়স্ক ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন এর প্রয়োজন হচ্ছে ৪০ মিলিগ্রাম। এটা শরীরে জমা হয়ে থাকে না অতিরিক্ত মাত্রা প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে বাইরে বেরিয়ে যায়।

ভিটামিন-ই

ভিটামিন-ই-ও এ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে আর ঝিল্লীর ওপরে জমা হয়ঃ যার কারণে সেটাকে প্যারক্সাইডসয়ের ক্রিয়া থেকে রক্ষা করে। বাঁচায় আর অক্সিজেনের বিষাক্ত প্রভাবকেও আটকায়.. এই প্রকার এটা অক্সিজের মুক্ত কাণাগুলোকে মজবুত করে তুলে শরীরের রোগগুলোর সঙ্গে লড়ার শক্তি প্রদান করে আর হৃদয় রোগ থেকেও সুরক্ষা প্রদান করে।

ভিটামিন-ই গম, অঙ্কুরিত আনাজ, গোটা আনাজ, স্যালাড ইত্যাদিতে পাওয়া যায়। এছাড়া আরও কিছু তত্ত্বও আমাদের শরীরে এ্যান্টি-অক্সিডেন্টের কাজ করে, যেমন- সেলেনিয়াম, মেলিডেনম ইত্যাদি।

০ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস

সিনিয়র কনসালটেন্ট , শহীদ সোহরাওয়াদী হাসপাতাল, ঢাকা। করোনারী আর্টারী ডিজিস প্রিভেনশান এন্ড রিগ্রেশান সিএডিপিআর সেন্টার, ৫৭/১৫ পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা। ফোনঃ ০১৯২১৮৪৯৬৯৯।

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক, আগস্ট-২০০৯

সর্পদংশন বিষয়ে প্রথম জাতীয় জরিপ

৮৬ শতাংশ মানুষ ওঝার কাছে যায়। চিকিৎসকেরকাছে যায় ৩ শতাংশ। আক্রান্ত বরিশালে বেশি, সিলেটে কম। বছরে বিশ্বে আক্রান্ত ৩০ লাখ, মারা যায় দেড় লাখ
বছরে প্রায় ৬ লাখ মানুষ সাপের কামড় খায়, মারা যায় ৬০৪১
শরিফুজ্বামান, প্রথম আলো

সাপে কামড়ানোর পর ৮৬ শতাংশ মানুষ ওঝার কাছে যায়। চিকিৎসকের কাছে যায় মাত্র তিন শতাংশ। বাংলাদেশে সাপের কামড় এবং এর ঝুঁকি নিরূপণ বিষয়ে এক গবেষণায় এ তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষকেরা বলছেন, এ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে এটাই প্রথম জরিপ।
গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের গ্রামে বছরে প্রতি এক লাখের মধ্যে ৬২৩ জন সাপের কামড়ের শিকার হয়। এই হিসাবে গ্রামে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে পাঁচ লাখ ৮৯ হাজার ৯১৯ জন সাপের কামড়ের শিকার হয়। এদের মধ্যে বছরে মারা যায় ছয় হাজার ৪১ জন। সারা বিশ্বে এই সংখ্যা দেড় লাখেরও বেশি।
গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রায় ৮০ প্রজাতির সাপ আছে। এর মধ্যে বিষধর সাপ রয়েছে ২২ প্রজাতির। তাঁরা সাপের কামড়কে বাংলাদেশের প্রাচীন ও অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। এ সম্পর্কে জাতীয় ধারণা তৈরির জন্য তাঁরা এ ধরনের গবেষণায় সম্পৃক্ত হয়েছেন বলে জানান।
দেশে সরকারি-বেসরকারিভাবে প্রচলিত পুরোনো তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ৮-১০ হাজার মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হয়। এদের মধ্যে মারা যায় হাজার দুয়েক। বাংলাদেশে প্রতি লাখে ৪ দশমিক ৩ জন সাপের কামড়ের শিকার হয় বলে এত দিন তথ্য ছিল।
এই গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিশ্বব্যাংক ও অস্ট্রেলিয়ার নিউ ক্যাসেল ইউনিভার্সিটি। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক রিদওয়ানউর রহমান ও অস্ট্রেলিয়ার নিউ ক্যাসেল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক আবুল হাসনাৎ মিল্টন গবেষণা সম্পন্ন করেছেন। তাঁদের সঙ্গে আরও আছেন নিউ ক্যাসেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এলিসন জনস ও অধ্যাপক ক্যাথারিন ডেসটি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক এম এ ফয়েজ প্রমুখ।
হাঁটার সময় সাপে কামড়ায় বেশি: গবেষণায় দেখা গেছে, হাঁটার সময় সাপের কামড়ের ঘটনা বেশি ঘটে এবং গ্রামাঞ্চলে মোট আক্রান্তের ২৭ শতাংশ এভাবে চলার পথে দংশিত হয়। এ ছাড়া পানিতেও দংশিত হয় ২৭ শতাংশ মানুষ।
এ প্রসঙ্গে আবুল হাসনাৎ বলেন, গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে রাতের বেলায় হাঁটার সময় সাপে কামড়ানোর ঘটনা বেশি ঘটে। এ ছাড়া ঘুমের মধ্যেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে।
বরিশালে বেশি, সিলেটে কম: দেশের ছয়টি বিভাগের মধ্যে বরিশালে সাপে কামড়ানোর ঘটনা বেশি। ওই বিভাগে বছরে প্রতি লাখে দুই হাজার ৬৬৭ জন দংশিত হয়। এই সংখ্যা খুলনা বিভাগে প্রতি লাখে ৯৩৬ জন। নদীবহুল ও উপকূলীয় অঞ্চলে সাপের প্রকোপও বেশি।
চট্টগ্রাম বিভাগে সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয় ৩৯৭ জন। পাহাড়ি এলাকা হলেও ওই অঞ্চলে সাপে কামড়ানো এবং মৃত্যুর ঘটনা তুলনামূলক কম পাওয়া গেছে। এর কারণ হিসেবে একজন গবেষক বলেছেন, সাপের উপদ্রব সম্পর্কে ওই এলাকার মানুষ বেশি সচেতন এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ বিষয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। তা ছাড়া পাহাড়ি এলাকায় ওঝাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ফৌজদারহাটে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস প্রতিষ্ঠার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং সেখানে সাপে কামড়ানোসহ এ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে। রাজশাহী বিভাগে প্রতি লাখে ৪৭২ জন এবং ঢাকা বিভাগে প্রতি লাখে ৪৪০ জন সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়।
ওঝাই ভরসা: গবেষণা অনুযায়ী, সাপে কামড়ানোর পর ৬০ শতাংশ মানুষ বা তাদের আত্মীয়স্বজন দোয়া-দরুদ ও মন্ত্র পাঠ করে। ৭৫ শতাংশ দুই ঘণ্টার মধ্যে কোনো না কোনো ধরনের চিকিৎসা নেয়। বিশেষ করে ওঝার কাছে যায়।
এ প্রসঙ্গে রিদওয়ানউর রহমান বলেন, ওঝাদের প্রশিক্ষণ দিলে সাপে কামড়ানো রোগীকে ছয় থেকে ১২ ঘণ্টা টিকিয়ে রাখা যায়। তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে যাওয়ার আগেই সাপে কামড়ানো অর্ধেক রোগী মারা যায়। এ জন্য ওঝাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে এবং কমিউনিটি হাসপাতালে এর চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলে সাপের কামড়ে প্রাণহানির ঘটনা কমে আসবে।
সাপে কামড়ালেই মৃত্যু নয়: গবেষণায় বলা হয়েছে, সাপে কামড়ানোর পর ৬০ শতাংশ রোগী মনে করে যে বিষধর সাপই তাদের কামড় দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সাপে কামড়ানো ৯০ শতাংশের বেশি রোগী বেঁচে যায়।
রিদওয়ানউর রহমান বলেন, অধিকাংশ সাপই বিষধর নয়। বিষধর সাপ কামড়ালেও পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া গেলে রোগী বেঁচে যায়। বিষধর সাপ কামড় দিলে রোগী অজ্ঞান হয়ে যায়, মরার মতো হয়ে থাকে। কিন্তু মারা যায় কয়েক ঘণ্টা পর। তিনি আরও বলেন, গোখরা, দুমুখো সাপ, গাছে থাকা সাপসহ কয়েকটি প্রজাতির সাপের কামড়ে মৃত্যু ঘটে।
বিশ্বে মারা যায় দেড় লাখ: প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় দেড় লাখ মানুষ সাপের কামড়ে মারা যায়। আর সাপ কামড় দেয় প্রায় ৩০ লাখ মানুষকে। আক্রান্ত ও মারা যাওয়া মানুষের প্রায় সবাই দরিদ্র এবং গ্রামের অধিবাসী।
গবেষকেরা বলেছেন, অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলের মতো উন্নত কিছু দেশে সাপের প্রকোপ রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত ও নেপালে সাপের প্রকোপ বেশি। তবে নেপালের গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের সাদৃশ্য রয়েছে। নেপালে প্রতি লাখে সাপের কামড়ের শিকার হয় এক হাজার ১৩০ জন।
অধ্যাপক এম এ ফয়েজ বলেন, সাপের কামড় হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অবহেলিত স্বাস্থ্য সমস্যা। এটা মূলত গ্রামের দরিদ্র মানুষের সমস্যা। এর চিকিৎসা, ওষুধ, প্রশিক্ষণ, প্রতিকারসহ বিভিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বলে তিনি মনে করেন।
রিদওয়ানউর রহমান বলেন, সারা বিশ্বে এমনকি বাংলাদেশে সাপের কামড় সম্পর্কে যে পরিসংখ্যান রয়েছে, তা বাস্তবের তুলনায় অনেক কম। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ধনী দেশ, বিত্তবান বা শহরের মানুষ সাপের কামড়ে সাধারণত আক্রান্ত হয় না। সংক্রামক রোগ না হওয়ার কারণে সাপে কামড়ানোর বিষয়টি উন্নত বিশ্বের নজরে আসছে না।
আবুল হাসনাৎ বলেন, পৃথিবীতে বিষক্রিয়াসংক্রান্ত সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটে সাপের কামড়ে। কিন্তু বিষয়টি ততটা গুরুত্ব পায় না। বৈজ্ঞানিক উপায়ে ছয়টি বিভাগের গ্রামীণ তিন হাজার ৯৯৩টি পরিবারের ১৮ হাজার ৮৫৭ জনের ওপর জরিপ চালিয়ে এবং গবেষণার মাধ্যমে এ সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে।

সূত্রঃ প্রথম আলো, আগস্ট-২০০৯

ডায়রিয়া ও আমাশয়ে কাঁচকলা উপকারী

সবুজ কলা, যা সাধারণের কাছে কাঁচকলা নামে পরিচিত, সেই কাঁচকলা ডায়ারিয়া ও রক্ত আমাশায় বা ব্লাড ডিসেন্ট্রিতে উপকারী বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। আমেরিকান গ্যাস্ট্রো অ্যান্ট্রলজি অ্যাসোসিয়েশনের গ্যাস্ট্রো অ্যান্ট্রোলজি জার্নালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ তথ্য জানিয়েছেন আইসিডিডিআরবির গবেষক, ডা. জিএইচ রব্বানী। ১-২ বছর বয়সের ২০০ শিশুর ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, শতকরা ৭০-৮৫ ভাগ ক্ষেত্রে ২-৪ দিনের মধ্যে ডায়ারিয়া ও রক্ত আমাশয়ে আক্রান্ত শিশুরা সেরে উঠছে। গবেষণায় বলা হয়েছে কাঁচকলায় রয়েছে বিশেষ ধরনের স্টার্চ বা শকরা জাতীয় উপাদান, যা মানুষের হজমযোগ্য নয়। এই উপাদানটি পরিপাকনালী পৌঁছার পর সেখানে অবস্থিত ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা ভেঙে ফ্যাটি এসিডে পরিণত হয়। এ ফ্যাটি অ্যাসিড পরিপাকনালী থেকে লবণ ও পানিকে শোষণ করে ধরে রাখার মাধ্যমে ডায়রিয়া রোধ করে। এ গবেষনার সময় ২৫০ গ্রাম সিদ্ধ করা কাঁচকলার সঙ্গে ১০ গ্রাম চালের গুঁড়া এক সঙ্গে রান্না করে ধকধকে জাউ হিসেবে চামচ দিয়ে শিশুদের খাওয়ানো হয়, যেহেতু চার মাস বয়সের আগে শিশুদের হজমক্ষমতা পূর্ণতা পায় না; তাই এই বয়সের আগে কাঁচকলার এই জাউ খাইয়ে কোনো লাভ হবে না। কিন্ত্ত সব বয়সের ক্ষেত্রে কাঁচকলা ডায়রিয়া কমাতে কতটুকু সাহায্য করবে তা নিয়ে এখনো গবেষণা হয়নি। তা ছাড়া এ গবেষণা ডায়রিয়া আক্রান্ত হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের ওপর পরিচালিত হওয়ায় ডায়রিয়ার শুধু কাঁচকলার জাউ খেলেই চলবে কি না, সে সম্পর্কে এখনো কোনো গবেষণা হয়নি। গবেষণায় আরো বলা হয়, যেকোনো জাতের কাঁচকলা দিয়েই এটি তৈরি করা যেতে পারে। তবে পাকা কলায় এই উপকরণ পাওয়া যাবে না। কারণ পেকে যাওয়ার সঙ্গে বিশেষ ধরনের সেই স্টার্চ চিনিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়।

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক

১৬ বছরের কম বয়সীর জন্য এসপিরিন নিষিদ্ধ

এসপিরিন অতি পরিচিত ও সমাদৃত একটি ওষুধ। শত বছর আগে আবিস্কৃত এ ওষুধটি মাথাব্যথা থেকে শুরম্ন করে হার্টের সমস্যা সব ক্ষেত্রেই ব্যবহার সর্বজনবিদিত। কিন্ত্ত শিশুদের বেলায় এই এসপিরিন ব্যবাহর ঝুঁকিপূর্ণ বলে এতদিন শিশুদের ক্ষেত্রে এসপিরিন ব্যবহার করা হতো না। কিন্ত্ত সাম্প্রতিকালে অস্ট্রেলিয়ার কমিটি অন সেফটি অব মেডিসিন (সিএসএম) এসপিরিন ব্যবহারের বিষয়ে আরো বেশি সতর্কতা অবলম্বনের কথা উল্লেখ করে ১৬ বছরের কম বসয়ীদের ক্ষেত্রে এসপিরিন নিষিদ্ধ করার সুপরিশ করেছে। যদিও ১৩-১৫ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এসপিরিন ততটা ঝুঁকিপূর্ণ না হলেও শিশুদের বেলায় এসপিরিনের অন্যতম পাশ্র্বপ্রতিক্রিয়া রেইস সিনডোমের কথা বিবেচনায় এনে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

০ ডা. কাজী মাহবুবা আক্তার

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক

Thursday, August 6, 2009

উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা

আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী
সহযোগী অধ্যাপক, কার্ডিওলজি
ঢাকা মেডিকেল কলেজ

বিশ্বের প্রায় ১৫০ কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে। সারা বিশ্বে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (ব্রেইন স্ট্রোক), হূদরোগ ও কিডনি রোগের এককভাবে সবচেয়ে বড় কারণ হলো উচ্চ রক্তচাপ। কাজেই এর চিকিৎসায় জনসচেতনতা সৃষ্টি এক বিশাল জনগোষ্ঠীর উপকারে আসবে। যেহেতু উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা প্রায়ই সারা জীবনের চিকিৎসা, কাজেই রোগীদের তাদের নিজেদের রোগ সম্পর্কে কিছুটা কার্যকর জ্ঞান রাখা প্রয়োজন।

একজন চিকিৎসক উচ্চ রক্তচাপের রোগীর চিকিৎসা করার সময় তিনটি দিকে নজর দেন। প্রথমত, রোগী সত্যি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে কি না এবং ভুগে থাকলে সেটি কোন পর্যায়ের উচ্চ রক্তচাপ; দ্বিতীয়ত, উচ্চ রক্তচাপের কারণে তার শরীরের কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হলো কি না; তৃতীয়ত, উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে তার হূদরোগের আর কোনো ঝঁুকি আছে কি না।
টারগেট ওরগান ড্যামেজ বা টিওডি বলতে বোঝায় উচ্চ রক্তচাপ দেহের যেসব প্রধান অঙ্গের ক্ষতিকর পরিবর্তন আনে সেগুলোকে। এর মধ্যে আছে হূৎপিণ্ডে দেয়াল পুরু বা মোটা হয়ে যাওয়া এবং হার্ট ফেইলিওর হওয়া, কিডনি ড্যামেজের জন্য রক্তের ক্রিয়েটিনিন সামান্য বেড়ে যাওয়া (১.৩-১.৫ মিলি গ্রাম %) বা প্রস্রাবে সামান্য প্রোটিন যাওয়া, চোখের রেটিনায় অতিরিক্ত রক্তচাপের জন্য রক্তনালির পরিবর্তন বা রক্তপাত, আর রক্তবাহী ধমনির দেয়ালে অ্যাথেরোসক্লেরোটিক প্লাক (চর্বির চর) জমে ধমনির দেয়াল মোটা হয়ে যাওয়া (বিশেষত ক্যারোটিড ধমনিতে, যেটি মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ করে)। পূর্ববর্তী হার্টের ব্যথা বা এনজাইনা এবং হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস; পূর্ববর্তী বাইপাস অপারেশন বা এনজিওপ্লাস্টির (রিং বসানো) ইতিহাস কিংবা পূর্ববর্তী ব্রেইন স্ট্রোক থাকলে একটি উচ্চ রক্তচাপের রোগীর ভবিষ্যতে বড় কোনো কার্ডিওভাসকুলার সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি স্বভাবতই অনেক বেড়ে যায়।

কার্ডিওভাসকুলার রিস্ক বলতে বোঝানো হয় উচ্চ রক্তচাপ ছাড়াও ধূমপান, ওজন বেশি হওয়া, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল বেশি হওয়া, কিডনির ক্ষতি হওয়া, বয়স (পুরুষদের ক্ষেত্রে ৫৫ বছরের বেশি, মেয়েদের ক্ষেত্রে ৬৫ বছরের বেশি), পারিবারিক হূদরোগের ইতিহাস ও শারীরিক পরিশ্রম কম করা।

একজন উচ্চ রক্তচাপের রোগীর চিকিৎসা করতে গেলে চিকিৎসক দুটি বিশেষ টার্গেটে দৃষ্টি দেবেন। প্রথমত, রক্তচাপকে সুনির্দিষ্ট স্তরে নামিয়ে আনা; দ্বিতীয়ত, তার টিওডি ও কার্ডিওভাসকুলার ঝঁুকিগুলো ভালো করে অনুসন্ধান করে সেগুলো যতদূর সম্ভব নিয়ন্ত্রণে আনা।

কোনো ঝঁুকি (রিস্ক ফ্যাক্টর) বা টিওডি ছাড়া রোগীর রক্তচাপ ১৪০/৯০-এর নিচে আনতে পারলেই চলবে। কিন্তু ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো রিস্ক ফ্যাক্টর অথবা টিওডি থাকলে সে ক্ষেত্রে টার্গেট হলো ১৩০/৮০-এর নিচে। যদি কিডনি ড্যামেজ থাকে, তবে টার্গেট প্রেসার হলো ১২৫/৭৫ বা এর নিচে।

এই লক্ষ্য সামনে রেখে চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসায় এগোবেন দুটি পদ্ধতিতে। একটি হচ্ছে, রোগীর জীবন যাপন পদ্ধতি বা লাইফ স্টাইল পরিবর্তন করবেন। আরেকটি হলো, প্রয়োজনীয় ওষুধ দেবেন। প্রথমটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সব রোগীর জন্যই প্রযোজ্য। অনেক রোগীর জন্য এবং প্রি-হাইপারটেনশন গ্রুপের রোগীদের জন্য শুধু এটিই যথেষ্ট। খাবারে সোডিয়াম অর্থাৎ লবণ একদম কমিয়ে দেওয়া, পটাশিয়াম বেশি আছে এমন খাবার (যেমন−বিভিন্ন ফল ও সবজি) বেশি খাওয়া, খাদ্য তালিকায় অাঁশযুক্ত খাবার বাড়িয়ে দেওয়া। এগুলো রক্তচাপ কমাতে এবং ভবিষ্যতে উচ্চ রক্তচাপের রোগী না হতে সাহায্য করে। এবারের বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবসের (১৭ মে) স্লোগান ছিল ‘লবণ ও উচ্চ রক্তচাপ: দুটি নীরব ঘাতক। ভালো করে জানুন, দীর্ঘদিন বাঁচুন।’

খাবারের লবণ যদি অর্ধেক কমানো যায়, তবে সারা বিশ্বে বছরে ২৫ লাখ মানুষ ব্রেইন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক বা ক্রনিক কিডনি রোগ থেকে বেঁচে যেতে পারে।

চর্বিযুক্ত খাদ্যের সরাসরি রক্তচাপের ওপর প্রভাব নেই; তবে ওজন বাড়িয়ে ও রক্তের চর্বি বাড়িয়ে রক্তচাপ বাড়াতে পারে এবং হূদরোগের ঝুঁকিও অনেক বাড়িয়ে দেয়। খাদ্যের প্রোটিন যদি অ্যানিমেল সোর্স থেকে না এসে প্লান্ট সোর্স থেকে আসে (যেমন−ডাল, শাকসবজি ইত্যাদি), তবে তা বেশি উপকারী বটে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৫ শতাংশ ওজন বাড়লে রক্তচাপ বাড়ার ঝুঁকি বাড়ে ২০-৩০ শতাংশ। ওজন কমলে তেমনি রক্তচাপও কমে আসে অনেক। ধূমপান বন্ধ করা রক্তচাপ কমার ওপর যতটা না প্রভাব ফেলে, এর চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব ফেলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমানোয়।
একইভাবে অ্যালকোহল গ্রহণে পরিমিতিবোধ রক্তচাপ যেমন কমিয়ে আনে, এরও বেশি কমায় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি। শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম উপকার করে নানাভাবে। এটি ওজন কমায়, কোলেস্টেরল কমায়, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে এবং রক্তচাপও কমায়। সপ্তাহের অধিকাংশ সময় (সম্ভব হলে সব দিন) ৩০-৪০ মিনিট মাঝারি পরিশ্রমের কাজ বা হাঁটা কিংবা ব্যায়াম করলেই এ উপকারটুকু পাওয়া সম্ভব। কাজেই হাঁটুন, দৌড়ান এবং লিফটে না চড়ে সিঁড়ি ব্যবহার করুন।

মানসিক চাপ, বিশেষ করে কর্মস্থলের মানসিক চাপ রক্তচাপ বাড়ায়। কাজেই মানসিক চাপ এড়াতে নিজের শখের কিছু কাজ করুন। ছুটি নিন, বিশ্রাম নিন, আর সময়মতো ঘুমানোর অভ্যাস করুন।

এ সবকিছুই আপনার রক্তচাপ এবং কার্ডিওভাসকুলার ঝঁুকি কমাতে সাহায্য করবে। ওষুধ দেওয়ার সময় চিকিৎসক রক্তচাপের মাত্রা ও সম্পর্কিত অন্যান্য রোগ বা অসুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় নেন। রোগীর কোনো বিশেষ ওষুধে কোনো পাশ্র্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে কি না বা রোগীর আর্থিক ক্ষমতা অনুযায়ী ওই ওষুধগুলো তার সামর্থেযর আওতায় কি না, এগুলোও কিন্তু বিবেচনার বিষয়।

শেষ কথাটি হলো, উচ্চ রক্তচাপের মতো একটি সারা জীবনের রোগের চিকিৎসায় রোগী আর চিকিৎসক দুজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই শুধু এনে দিতে পারে সফল ও দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসার সম্ভাবনা। কাজেই চিকিৎসক তাঁর জ্ঞান দিয়ে চিকিৎসার প্ল্যান করে দেবেন, রোগী তাঁর শ্রম, অর্থ ও আন্তরিক প্রচেষ্টা দিয়ে সেই প্ল্যানটি বাস্তবায়ন করবেন। তাহলেই দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন যাপনে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারব।

সূত্রঃ প্রথম আলো, ২০০৯