Showing posts with label হৃদরোগ প্রতিরোধ. Show all posts
Showing posts with label হৃদরোগ প্রতিরোধ. Show all posts

Tuesday, August 11, 2009

মন ভালো তো হূদযন্ত্র ভালো

আহমেদ হেলাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
হূদয় বা মন, এর সঙ্গে হূদ্যন্ত্রের সত্যিকারের যোগাযোগ কতটুকু, তা নিয়ে যতই বিতর্ক আর গবেষণা চলুক, এ কথা আজ নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত যে মনের সমস্যার সঙ্গে হূদরোগের একটা সম্পর্ক রয়েছে। ব্যক্তিত্বের ধরন, মনের অসুখ, চাপ, উৎকণ্ঠা, বিষণ্নতা ইত্যাদি মানসিক অবস্থা হূদরোগের অন্যতম কারণ বলে আবিষ্কৃত হয়েছে।

সাম্প্রতিককালে এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী বহু গবেষণা হচ্ছে, মনের সমস্যার সঙ্গে হূদরোগের সম্পর্ক এখন প্রমাণিত সত্য, কিন্তু বিষয়টি আলোচিত হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এইচ এফ ডাম্বার তাঁর ইমোশন অ্যান্ড বডিলি চেঞ্জ গ্রন্থে এ বিষয়ে গবেষণাপ্রসূত তথ্য দেন।

তিনি বলেন, আবেগের নানা রকম সমস্যা, মানসিক চাপ ও ব্যক্তিত্বের ধরন হূদরোগের অন্যতম একটি কারণ। তিনি সর্বপ্রথম ‘করোনারি পারসোনালিটি’ নামে ব্যক্তিত্বের প্রকরণ ব্যাখ্যা করেন এবং বলেন, এ ধরনের মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তির হূদরোগ হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেশি। এ ধরনের ব্যক্তিত্বের আচরণকে পরে ১৯৬০ সালে ফ্রাইডম্যান ও রোসেনম্যান ‘টাইপ-এ আচরণ’ বলে উল্লেখ করেছেন।

পরবর্তী আরও গবেষণায় ১৯৭৫ সালে ফ্রাইডম্যান ও তাঁর সহযোগীরা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেন, যাদের মধ্যে টাইপ-এ আচরণ দেখা যায় বা যারা করোনারি পারসোনালিটির অধিকারী, তাদের হূদরোগ হওয়ার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের চেয়ে আড়াই গুণ বেশি! কেমন আচরণ হয় করোনারি পারসোনালিটির মানুষের, আর টাইপ-এ আচরণই বা কী?

গবেষণায় এ ধরনের ব্যক্তিত্বের যে বৈশিষ্ট্য ও আচরণগুলো বের হয়ে এসেছে, তা হলো:

ক্রমাগত আবেগের সমস্যায় থাকা, সামান্য মনখারাপের বিষয়ে বেশি ভেঙে পড়া বা কোনো ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় অত্যধিক আবেগ প্রকাশ করা। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে আশপাশের মানুষের চেয়ে সুবিধাবঞ্চিত থাকা। অতিরিক্ত কাজের চাপ ও কর্মপরিধির মধ্যে কোনো বিষয় নিয়ে মানসিক চাপ বোধ করা। কোনো কারণ ছাড়াই পারিপাশ্র্বিকতার প্রতি বৈরী ভাব পোষণ করা (যেমন−এ দেশের সবাই খারাপ, সব মানুষ লোভী, কেউ ভালো নয়, সবাই আমার শত্রু ইত্যাদি মনে করা)।

সব সময় একটা প্রতিযোগিতামূলক আচরণ করা, বেশি পরিমাণে উচ্চাভিলাষী হওয়া (যেমন−অমুকের চেয়ে আমার এ বিষয়ে ভালো করতেই হবে, ওর আগে আমার প্রমোশন হতেই হবে, আমার সন্তানকে ছবি অাঁকার প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পেতেই হবে ইত্যাদি মনোভাব)। কারণে-অকারণে সব কাজে তাড়াহুড়ো করা। সব সময় একটা পূর্বনির্ধারিত ‘ডেডলাইন’ মাথায় রাখা যে এ সময়ের মধ্যে বিষয়টির নিষ্পত্তি হতে হবে, সময়মতো না হলে তীব্র মানসিক চাপে ভোগা। হুট করে রেগে যাওয়া, অধৈর্য হওয়া, খিটখিটে আচরণ করা। এ ধরনের আচরণ আর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তিরা আক্রান্ত হতে পারে হূদ্যন্ত্রের যেকোনো রোগে, বিশেষত রক্ত সরবরাহ-সংক্রান্ত জটিলতায় (ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ), যার প্রধান লক্ষণ হচ্ছে বুকে ব্যথা আর পরিণতিতে মৃত্যু।

এ তো গেল আচরণ আর ব্যক্তিত্বের কথা। এদিকে কিছু মানসিক রোগের সঙ্গেও সরাসরি হূদরোগের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা।

যেমন উৎকণ্ঠা (অ্যাংজাইটি) আর অনিয়ন্ত্রিত রাগের কারণে হতে পারে এনজিনা বা ব্যথাযুক্ত হূদরোগ। তীব্র বিষণ্নতা ও উৎকণ্ঠার যদি চিকিৎসা করা না হয়, তবে এ দুটি রোগ থেকে হতে পারে ‘মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন’ নামের মারাত্মক হূদরোগ, যাতে মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। এ ছাড়া আরেকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন যে বিষণ্নতা, সিজোফ্রেনিয়াসহ নানা রকম মানসিক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহূত দু-একটি ওষুধ হূদ্যন্ত্রের ওপর পাশ্র্বপ্রতিক্রিয়া করতে পারে। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ ও হূদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহূত কোনো কোনো ওষুধ বিষণ্নতাসহ আরও কিছু মানসিক সমস্যার কারণ হতে পারে।

সম্প্রতি আরেক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, যাদের সফলভাবে করোনারি বাইপাস সার্জারি বা হূৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, তাদের মধ্যে একটি বড় অংশ পরবর্তী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে মাঝারি থেকে তীব্র বিষণ্নতা ও মানিয়ে চলার সমস্যায় (অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিজঅর্ডার) আক্রান্ত হতে পারে, যা তাদের জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দেয় ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়।

সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রে এসব রোগীকে অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে হূদরোগ বিশেষজ্ঞের পাশাপাশি নিয়মিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হচ্ছে। হূদরোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় কেবল খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, ব্যায়াম আর ওষুধ সেবনই যথেষ্ট নয়; জীবনযাত্রার পরিবর্তন, আচরণের পরিবর্তন এবং সঠিক মানসিক সাম্যাবস্থাও প্রতিরোধ করতে পারে জীবনবিনাশী হূদরোগ। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে সবাইকে।

সূত্রঃ প্রথম আলো, আগস্ট-২০০৯

Friday, August 7, 2009

হৃদরোগীদের খাবার দাবার

সুপার-পোষক সমূহ বর্তমানে মেডিক্যাল আর বৈজ্ঞানিক রিসার্চের মনোযোগ আকৃষ্ট করেছে। এগুলো হচ্ছে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি আর ভিটামিন-ই-র অগ্রদূত। এই সব পোষক এক সাথে মিলে এমন শক্তিশালী জোট তৈরী করে, যেটা শরীরকে বেশ কিছু রোগের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে আর বয়স বাড়ার ক্রিয়াকেও কম করতে পারে।

এই সব ভিটামিন বেশ কয়েক ধরনের খাদ্য পদার্থে পাওয়া যায় আর প্রাকৃতিক রূপে ফল আর সব্জীর মধ্যে পাওয়া যায়, যেগুলো আমরা বেশী পরিমাণে খেতে পারিঃ বিশেষ করে যখন সেগুলোর মরশুম থাকে। অন্য দিকে ওষুধ খেলে তার সাইড এফেক্টস হতে পারে আর প্রাকৃতিক পোষকগুলোর সঙ্গে এর কোন মিলই নেই। আসলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংগঠন আর অন্য খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রাণালয়গুলোর সমর্থনে এই দিকে যথেষ্ট অনুসন্ধান চালানো হয়েছে।

বিটা-ক্যারোটিন, ভিটামিন-সি আর ভিটামিন-ই-র অদ্ভুত শক্তির ব্যাপারে প্রচুর অধ্যয়ন করা হয়েছে। স্বাধীন ভাবে ভিটামিন-এ ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই সেবন করা ব্যক্তিদের মধ্যে ক্যান্সার, এ্যাঞ্জাইনা আর হৃদয় রোগ কম দেখতে পাওয়া যায় আর তাদের আয়ুও লম্বা হয়।

শরীরকে চালানোর জন্য ভোজন থেকে প্রাপ্ত অক্সিজেনের সঞ্চার হিমোগ্লোবিনের লাল রং-য়ের কণাগুলো দ্বারা হয়, যাতে লৌহ থাকে। রক্ত-প্রবাহে অক্সিজেন কোশিকাগুলোকে জীবিত রাখার জন্য গ্রহণ করা হয়। এই ক্রিয়াকে অক্সিডেশন বলা হয়। যদিও এই অক্সিজেন মুক্ত কণার নির্মাণও করে, যেটা অধিক পরিমাণে হয়ে পড়লে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

মুক্ত কণা অক্সিডেশনের ক্রিয়ার সময় সৃষ্টি হয়। যখন শরীর অক্সিজেনের ব্যবহার করে, তখন সেটা এনার্জি তৈরী করার জন্য ভোজনকে বিঘটিত করে। এটা কীটানু, ওজোন আর কর্বন মোনো-অক্সাইডের মত বিষাক্ত তত্ত্বগুলোকেও নষ্ট করে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় মুক্ত কণাও সৃষ্টি হয় এই সব কণা কোশিকাগুলোর ঝিল্লীকে নষ্ট করে দেয় আর ক্রোমোসোন্স এবং জৈবীয় সামগ্রীগুলোর ক্ষতিসাধন করে। এটা মুল্যবান এঞ্জাইমগুলোকেও নষ্ট করে ফেলে, যার কারণে পুরো শরীরে নষ্ট হয়ে পড়ার এক প্রতিক্রিয়া শুরম্ন হয়ে পরে। এই ভাবে মুক্ত কণা করোনারী হৃদয় রোগ, ফসফুসের রোগ, কয়েক ধরনের ক্যান্সার, চোখের ছানি, আর্থারাইটিস, পার্কংসন্স রোগ আর বার্ধক্যের মত কমপক্ষে ৫০ শতাংশ রোগের এক বড় কারণ হয়ে ওঠে।

মুক্ত কণা থেকে হওয়া ক্ষতিকে আমরা দু ভাবে কম করতে পারি। প্রথম, আমাদের এমন তত্ত্ব আর গতিবিধির হাত থেকে বাচতে হবে, যেগুলো মুক্ত কণা সৃষ্টি হতে সহায়তা করে, যেমন-সিগারেট, প্রদুষণ আর সুর্যের আল্ট্রাভায়োলেট কিরণ।

দ্বিতীয়তঃ এটা সুনিশ্চিত করতে হবে যে, আমরা নিজেদের দৈনিক আহারে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি আর মিটামিন-ই সেবন করে, বেশী মাত্রায় এ্যান্টী-অক্সিডেন্ট গ্রহণ করব।

যদিও ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি আর ভিটামিন-ই মুক্ত কণা থেকে হওয়া ক্ষতির সঙ্গে লড়তে সহায়তা করে, বায়ু প্রদুষনও এই সব গুরম্নত্বপূর্ণ পোষকগুলোর সাপ্লাইকে কম করে তোলে। অধ্যয়ন থেকে এটা জানতে পারা গেছে যে, শহরে বাস করা ব্যক্তিদের মধ্যে, যারা প্রদুষিত হাওয়ায় শ্বাস নেন, এ্যান্টি-অক্সিডেন্টের স্তর কম থাকে। এর ফলে শরীরে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি আর ভিটামিন-ই-র আপুর্তি বিপজ্জনক ভাবে কমে আসে। এমনটা হলে এগুলোর জায়গা মুক্ত কনা নিয়ে আর অক্সিডেটিভ চাপয়ের সৃষ্টি হয়ে পড়ে। আমাদের ভোজনে মুক্ত কণা থাকাটা আমাদের পক্ষে বিপজ্জনক হয়। এর মুখ্য উৎস হচ্ছে ফ্যাট (যেমন বেশী তাপমাত্রায় গরম করা রান্না করার তেল) ফ্যাটকে যে মুহুর্তে গরম করা হয়, তার রাসায়নিক রচনা ভেঙে বিপজ্জনক হাইড্রোক্সিল কণা তৈরী করে। কোশিকাগুলোর আর ডিএনএয়ের প্রচণ্ড ক্ষতি করে। (সুর্যমুখীর তেলের মত পোলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশী তাপমাত্রায় কম স্থায়ী থাকে। এটা জৈতুনের তেলের মত মোনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট-য়ের তুলনায় দ্রম্নত অক্সিডেটেড হয়ে পড়ে।) মেডিক্যাল সায়েন্স সর্বদা ভিটামিনের লাভের প্রচার করে এসেছে আর বৈজ্ঞানিকেরাও এই জাদু তত্ত্বের সার্থকতা প্রমানিত করার জন্য কঠোর প্ররিশ্রম করেছেন। এ্যান্টী-অক্সিডেন্টসের বিচার সম্বন্ধিত রূপে কিছুটা নতুন।

এ্যান্টী-অক্সিডেন্টস প্যাথোলোজিক্যাল পরিস্থিতি গুলোয় চিকিৎসায় নতুন পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে যেমনঃ

০ কার্ডিয়োভাস্কুলার রোগ- সিএইচডি, উচ্চ রক্তচাপ।

০ সেরিব্রোভাস্কুলার রোগ।

০ মেটাবোলিজম রোগ-ডায়াবেটিজ মেলিটাস।

০ শিরার রোগ- এলে&জমিট রোগ, মৃগী।

০ বিপোষক রোগ- চোখের ছানি, আর্থারাইটিস, বার্ধযক্য।

০ ক্যান্সার।

ভিটামিন-এ

ভিটামিন-এ দু প্রকারের হয়। প্রথম, পশুদের থেকে প্রাপ্ত উৎপাদন, যেমন মাংস আর দুধে পাওয়া যায়। একে রেটিনল বলা হয়; এবং দ্বিতীয় ফল আর সব্জীতে পাওয়া যায়, যাকে- ক্যারেটিন’ বলা হয়। বিটা-ক্যারেটিনই এ্যান্টী- অক্সিডেন্টের রূপে কাজ করে।

শরীরের বিকাশ আর তন্ত্রগুলোকে সুস্থ রাখার জন্য ভিটামিন-‘এ’-র প্রয়োজন হয়। এর অভাব হয়ে পড়লে ত্বক আর চোখ অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে আর সুস্থ হাড় আর ভালো দাঁত তৈরী হতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। যদি এর অভাবের চিকিৎসা সময় থাকতে না করানো হয়, তাহলে ব্যক্তি পুরোপুরি অন্ধ ও হয়ে পড়তে পারেন। ভারতে অন্ধত্বের কারণগুলোর মধ্যে সব থেকে সাধারণ কারণ হচ্ছে ভিটামিন- ‘এ’-র অভাব। বিটা- ক্যারোটিন বেশ কিছু ফল আর সব্জীতে পাওয়া যায়, যেমন- পালং শাক, ধনেপাতা, বাঁধাকপি, গাজর, আম, টমাটো ইত্যাদি। শরীরে এই ক্যারোটিন, ভিটামিন- ‘এ’তে পরিবর্তিত হয়ে পড়ে। বিটা- ক্যারোটিন রান্না করলে বা আল্ট্রা-ভায়োলেট কিরণের ফলে নষ্ট হয় না।

একজন বয়স্ক ব্যক্তির প্রতি দিন ৬০০ মিলি গ্রাম রেটিনল বা ২৪ মিলিগ্রাম বিটা-ক্যারোটিন-য়ের প্রয়োজন হয়। বাড়ন্ত বাচ্চা, গর্ভবতী মহিলা আর অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই প্রয়োজনটা আরও বেশী হয়। ১ মিলিগ্রাম বিটা-ক্যারোটিন= ০.২৫ মিলিগ্রাম রেটিনল।

বিটা-ক্যারোটিন দু ভাবে কাজ করে। প্রথমে এর কিছু অংশ ভিটামিন-এ তে পরিবর্তিত হয় আর অবশিষ্ট বিটা-ক্যারটিন এ্যান্টী-অক্সিডেন্টের রƒপে কাজ করে। এটা অত্যন্ত গুরম্নত্বপূর্ণ যে, বিটা-ক্যারোটিন আর ভিটামিন-এ-র মধ্যে যেন ভ্রমের সৃষ্টি না হয়ে পড়ে, কারন এই দুটো হচ্ছে আলাদা- আলাদা তত্ত্ব। আমাদের শরীর বিটা-ক্যারোটিনকে ভিটামিন-এ-তে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়।

যদিও, দীর্ঘ সময় ধরে বেশী পরিমাণে ভিটামিন-এ সেবন করাটা ক্ষতিকারক লক্ষন সৃষ্টি করতে পারে, যেমন- মাথা যন্ত্রণা, গা গোলানো, বমি, আলস্য, শুষ্ক ত্বক, ঠোঁট ফাটা ইত্যাদি।

ভিটামিন-এ-র প্রয়োজন শরীরের বিকাশ আর তার তন্ত্তগুলোকে সুস্থ রাখার জন্য হয়। এর গুরম্নত্বপূর্ন ভূমিকাগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে আমাদের কোশিকাগুলোকে স্বরক্ষাত্মক কবচ বা ঝিল্লি প্রদান করা। এটা মিউকাস ঝিল্লি-কেও সুরক্ষিত রাখে। এটা ফ্যাটে গুলো যায়। মাছের লিভারের তেল হচ্ছে ভিটামিন-এ-র সব থেকে ভালো প্রাকৃতিক উৎস।

বিটা-ক্যারোটিন হচ্ছে গাছের মধ্যে পাওয়া এক প্রাকৃতিক পদার্থ আর সবার আগে এটাকে গাজরের মধ্যে খুজে পাওয়া গেছিল.. এজন্য পুরো পরিবারকে ক্যারোটেনয়েডস& নাম প্রদান করা হয়েছিল। ক্রারোটেনয়েডস& নাম প্রদান করা হয়েছিল। ক্রারোটেনয়েডস& বেশ কিছু রঙ্গীন পদার্থ রয়েছে, যেগুলো প্রকৃতিতে দেখতে পাওয়া বেশ কিছু রং-য়ের ভাণ্ডার। বিটা-ক্যারোটিন গাঢ় লাল-কমলা রং-য়ের হয় এবং হলুদ আর কমলা গাঢ় সবুজ রংয়ের সব্জীতেও ক্যারোটিন থাকে, কিন্ত্ত ক্লোরোফিলের কারণে হলুদ আর কমলা রং চাপা পড়ে যায়.. কিন্ত্ত অনেকবার এটা বেশী চাপা পড়তে পারে না .. যেমন লাউতে।

বিটা-ক্যারোটিন হচ্ছে সব থেকে শক্তিশালী এ্যান্টী-অক্সিডেন্টসগুলোর অন্যতম, যেটা গাছকে সূর্যের আল্টা-ভায়োলেট কিরণে পুড়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। এটা হচ্ছে প্রকৃতির সঠিক রক্ষক। তরমুজ, বেদানা, আডু, আম আর গাজর, আলু, পালং শাক, টমাটো, আজওয়াইন, জলকুম্ভী আর ফুলকপির মত ফল আর সব্জীতে বিটা-ক্যারোটিন থাকে।

ভিটামিন-সি (এস্কোর্বিক এ্যাসিড)

এ্যান্টি- অক্সিডেন্টের রƒপে কাজ করা ছাড়াও ভিটামিন-সি-র আরও বেশ কিছু গুণ রয়েছে। এটা শরীরের বিকাশ আর শরীরের তন্ত্তগুলো, মাড়ি, দাত, রক্তের নাড়ি আর হাড়ে হয়ে পড়া ক্ষতিকে পুরণ করতেও সহায়তা করে। এটা শারীরিক ব্যবস্থায় শামিল থেকে ব্যাক্টেরিয়া আর ভাইরাল সংক্রমণয়ের সঙ্গে লড়তেও সহায়তা করে। ভিটামিন-সি-র অভাবের কারণে হেমারেজ ক্ষতস্থান শুকোতে সময় নেওয়া, স্কার্বি রোগ, মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, হাড়ের ধীর গতিতে নির্মান ইত্যাদি লক্ষন দেখতে পাওয়া যায়। ভিটামিন-সি আমলাতে পাওয়া যায়। ভিটামিন-সি-র ভালো উৎস হচ্ছে রসযুক্ত ফল, যেমন- পাতি লেবু, মুসম্বী লেবু, কমলা লেবু, পেয়ারা আর সবুজ পাতাওয়ালা সব্জী, যেমন- পালং শাক ইত্যাদি। কাটা আর রান্না একে নষ্ট করে দেয়। একজন বয়স্ক ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন এর প্রয়োজন হচ্ছে ৪০ মিলিগ্রাম। এটা শরীরে জমা হয়ে থাকে না অতিরিক্ত মাত্রা প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে বাইরে বেরিয়ে যায়।

ভিটামিন-ই

ভিটামিন-ই-ও এ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে আর ঝিল্লীর ওপরে জমা হয়ঃ যার কারণে সেটাকে প্যারক্সাইডসয়ের ক্রিয়া থেকে রক্ষা করে। বাঁচায় আর অক্সিজেনের বিষাক্ত প্রভাবকেও আটকায়.. এই প্রকার এটা অক্সিজের মুক্ত কাণাগুলোকে মজবুত করে তুলে শরীরের রোগগুলোর সঙ্গে লড়ার শক্তি প্রদান করে আর হৃদয় রোগ থেকেও সুরক্ষা প্রদান করে।

ভিটামিন-ই গম, অঙ্কুরিত আনাজ, গোটা আনাজ, স্যালাড ইত্যাদিতে পাওয়া যায়। এছাড়া আরও কিছু তত্ত্বও আমাদের শরীরে এ্যান্টি-অক্সিডেন্টের কাজ করে, যেমন- সেলেনিয়াম, মেলিডেনম ইত্যাদি।

০ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস

সিনিয়র কনসালটেন্ট , শহীদ সোহরাওয়াদী হাসপাতাল, ঢাকা। করোনারী আর্টারী ডিজিস প্রিভেনশান এন্ড রিগ্রেশান সিএডিপিআর সেন্টার, ৫৭/১৫ পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা। ফোনঃ ০১৯২১৮৪৯৬৯৯।

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক, আগস্ট-২০০৯

Thursday, August 6, 2009

হূদরোগ এড়াতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন

ফজলে রাব্বী খান

ডায়াবেটিস নিয়ে গণসচেতনতা এখন অনেক বেড়েছে। শুধু ডায়াবেটিস রোগী নয়, সাধারণ মানুষ ডায়াবেটিস-সংক্রান্ত তথ্য ও আলোচনার প্রতি অধিক আগ্রহী হচ্ছে। এই প্রবণতার সুফল যেমন আছে, তেমনি কুফলও আছে। তথ্য ও আলোচনার জন্য অনেক সময় মানুষ যথাযথ নয় এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হয়। ফলে ভুল ও বিভ্রান্তিকর ধারণাও লাভ করে অনেকে। আসুন, জেনে নিই এ সম্পর্কে।

ডায়াবেটিস কী?

আমাদের শরীরে শর্করা বা চিনিজাতীয় খাবারের প্রয়োজনীয় বিপাক না হলে রক্তে অব্যবহূত শর্করা বা চিনির পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। এ অবস্থাকে বলা হয় ডায়াবেটিস। প্রধানত দুটি কারণে এ রকম অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। শরীরে অগ্ন্যাশয় (প্যানক্রিয়াস) গ্রন্থিতে ইনসুলিন হরমোন নিঃসরণকারী বিটা সেলের পরিমাণ ব্যাপক হারে হ্রাস পাওয়া এবং বিটা সেল থেকে নিঃসৃত ইনসুলিন যদি কোষের ওপর সঠিকভাবে কাজ করতে না পারে। এ ক্ষেত্রে অগ্ন্যাশয় গ্রন্থিতে বিটা সেলের পরিমাণ শূন্যের কোঠায় পৌঁছলে তখন ইনসুলিন বাইরে থেকে নেওয়া (ইনজেকশনের মাধ্যমে) ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। এ ধরনের ডায়াবেটিসকে টাইপ-১ বা ইনসুলিননির্ভর ডায়াবেটিস বলে। অপরদিকে শরীর যখন ইনসুলিন তৈরি করতে পারে, অর্থাৎ সামান্য পরিমাণ বিটা সেল উপস্থিত থাকে কিন্তু শর্করার বিপাকের জন্য তা পর্যাপ্ত নয়, এ ধরনের ডায়াবেটিসকে টাইপ-২ ডায়াবেটিস বলে। এ ধরনের ডায়াবেটিস কিছু নির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনে চললে অর্থাৎ প্রাত্যহিক জীবনে সুনিয়ন্ত্রণ এলে ডায়াবেটিসও নিয়ন্ত্রণ থাকে।

ডায়াবেটিস দিন দিন যে প্রধান কয়েকটি জটিলতা তৈরি করে তা হলো, রক্তনালি ও হূৎপিণ্ডের নানা রোগ, চোখের রোগ ও কিডনির জটিলতা। আজ হূৎপিণ্ডের রোগ নিয়ে বলা হলো।

রক্তনালির প্রাচীরের পুরুত্ব বেড়ে যাওয়া (অ্যাথেরোসক্লেরোসিস)

শরীরে শর্করা বিপাকে গণ্ডগোল দেখা দিলে বাকি দুটি প্রধান খাদ্য উপাদান প্রোটিন বা চর্বিজাতীয় খাদ্যের বিপাকেও সমান গণ্ডগোল দেখা দেয়। এ কারণে শরীরে চর্বিজাতীয় খাবারের অনিয়ন্ত্রিত সঞ্চয় হয়ে থাকে। শরীরে বিভিন্ন স্থানে বিশেষত রক্তনালির প্রাচীরের বিভিন্ন স্তরে এভাবে চর্বি জমা হওয়ার ফলে রক্তনালির প্রাচীর পুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। এই অস্বাভাবিক ঘটনাকে অ্যাথেরোসক্লেরোসিস। রক্তনালির প্রাচীর মোটা ও শক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে নালির মধ্য দিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ রক্ত চলাচল বা পরিবহন ব্যাহত হয়ে থাকে। ফলে হূৎপিণ্ডের মধ্যে শরীরের প্রধান অঙ্গ পর্যন্ত রক্ত থেকে বঞ্চিত হয়। হূৎপিণ্ডে পর্যাপ্ত রক্ত না যাওয়ার ফলে নানা ধরনের মারাত্মক রোগ, যেমন−অ্যানজাইনা পেকটোরিস, হার্টঅ্যাটাক বা এমআই হতে পারে। এই দুটি রোগ থেকে মানুষের মৃত্যুও হতে পারে। ডায়াবেটিস অ্যাথেরোসক্লেরোসিস হওয়ার প্রধান কারণ, তবে একমাত্র কারণ নয়। সুতরাং অ্যানজাইনা বা হার্টঅ্যাটাক এড়ানোর জন্য ডায়াবেটিস কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার পরিমাণ নির্ণয় ছাড়াও বর্তমান একটি আধুনিক পরীক্ষা, রক্তের এইচবিএ১সি-এর পরিমাণ দেখা যেতে পারে। এই পরীক্ষাটির মাধ্যমে রক্তের দীর্ঘমেয়াদি শর্করা পরিমাণ জানা যেতে পারে। প্রতি তিন মাস পর পর এই পরীক্ষা করা যেতে পারে। রক্তের এইচবিএ১সি-এর পরিমাণ ৭ ভাগের নিচে থাকলে বোঝা যাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

মনে রাখতে হবে, ডায়াবেটিস উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে যুক্ত হলে হার্টঅ্যাটাকসহ হূদযন্ত্রের অন্যান্য জটিলতা বহুগুণ বেড়ে যায়। একটি সমীক্ষা না দিলেই নয়। সম্প্রতি জানা গেছে, এইচবিএ১সি শতকরা প্রতি ১ শতাংশ কমলে এমআই হওয়ার আশঙ্কা ১৪ শতাংশ কমে যায়। সঙ্গে সঙ্গে রক্তনালির অন্যান্য রোগও ৪৩ শতাংশ কমে যায়। অন্যদিকে কমার পরিবর্তে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে এইচবিএ১সি বাড়লে জটিলতাও সে হারে বাড়তে থাকে।

কী করতে হবে
কাজেই ডায়াবেটিসের প্রাত্যহিক মাত্রা ও জটিলতা সম্পর্কে খুব সজাগ হতে হবে। �� রক্তে চিনির পরিমাণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। যেমন− অভুক্ত অবস্থায় ৬ মিলিমোলের নিচে এবং খাওয়ার পরে থাকতে হবে ৮ মিলিমোলের নিচে। অন্যদিকে এইচবিএ১সি থাকতে হবে ৭ শতাংশের নিচে।

  • রক্তচাপ যেন অবশ্যই ১৩০/৮০ এর নিচে থাকে।
  • কোলেস্টেরল এলডিএল ১০০ মিলিগ্রাম/ডিএলের নিচে এবং এইচডিএল ৪০ (পুরুষের ক্ষেত্রে) এবং ৫০ (মেয়েদের ক্ষেত্রে) মিলিগ্রাম/ডিএলের ওপর থাকতে হবে। টাইগ্লিসারাইড যেন অবশ্যই ১৫০ মিলিগ্রাম/ডিএলের নিচে থাকে।
কাজেই নিজে নিজে নিয়মিত ডায়াবেটিসের মাত্রা নিরূপণ করে অস্বাভাবিক কিছু মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। অন্যদিক হূৎপিণ্ডের অবস্থা জানার জন্য বছরে অন্তত দুবার হূদরোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে।

হূদয় ভালো তো হূদরোগ বিদায়

এস কে অপু
হূদরোগ বিশেষজ্ঞ
ময়মনসিংহ চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়

হার্ট অ্যাটাক হচ্ছেই। এ হচ্ছে নেতিবাচক প্রভাব। রাত-দিন খাটছে, সৎ থাকছে। তবু নিগৃহীত। জীবনযুদ্ধে নেই পুরস্কার। পদোন্নতি নেই। বসাচ্ছে এনে অযোগ্য লোক। এ যেন মানসিক যন্ত্রণা আর নিগ্রহ। বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপ, ঘটছে হার্ট অ্যাটাক। কাজপাগল, ওপরে ওঠার জন্য খুব আগ্রহী কিংবা সারাক্ষণ প্রতিযোগিতা করতে চাওয়া বা আক্রমণাত্মক, তিরিক্ষি মেজাজের লোকেরাই ‘টাইপ-এ’ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হন। আজকাল এসব লোকের চেয়ে সুশীল সমাজে বেড়ে যাচ্ছে হার্ট অ্যাটাক। দেখা যাচ্ছে, যাদের জীবন চলছে দ্রুতগতিতে−ব্যস্ততায়, প্রতিযোগিতায় বা দ্রুত কথা বলে, তারা হূদয়টাকে রাখে সজীবতায়। ‘টাইপ-এ’ লোকের হূদরোগও কমে গেছে।

চাপ মোকাবিলা করুন দৃঢ়ভাবে
থাকুক না জীবনের চাপ। থাকুক লড়াই। যদি থাকে সমাজে পুরস্কার−হয় না হূদয় আহত। সৎ ও যোগ্যের প্রশংসা, ভালো কাজের পুরস্কার হলে, হার্ট হয়ে ওঠে সজীব-সতেজ। আজকাল গবেষণায় নতুন সুর−কোনো ব্যক্তির আবেগের নেতিবাচক দিক কিংবা ব্যক্তিত্বের নেতিবাচক দিকের কারণে হূদয় অকালেই ভেঙে পড়ছে। মৃত্যুও হচ্ছে। তাই চাপ মোকাবিলা করতে হবে দৃঢ়ভাবে।

দূরে ঠেলুন বিষণ্নতা
‘বিষণ্নতা’ মনকে করে কাবু। এতে হার্ট অ্যাটাক অতি দ্রুত ঘটে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বিষণ্ন মনের লোক তাদের হার্ট অ্যাটাকে, বিষণ্ন নয় এমন রোগীর তুলনায় চার গুণ বেশি ঝুঁকি। সুতরাং হার্ট অ্যাটাকের রোগীদের চাই মনের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। যদি বিষণ্ন মনে থাকে সারাক্ষণ, এসব রোগী কয়েক বছরের মধ্যেই আবার হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়। বিষণ্ন মানুষ বদভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে। ধূমপান বা মদ্যপান করে। সুষম খাবার খায় না। ব্যায়াম করে না। মন কেবলই উথালপাথাল। মনের ভেতর সব সময় নেতিবাচক প্রশ্ন। মন হয় ক্ষতবিক্ষত।

প্রফুল্ল থাকুন মন
বিষণ্ন ও ভগ্নমন থেকেই বাড়ে হূৎস্পন্দন। বেড়ে যায় স্ট্রেস হরমোনের মান। হূদ-ছন্দের ওঠানামা হয় অসংগতিপূর্ণ। রক্তের জমাটবাঁধা প্রক্রিয়া বেড়ে রক্ত জমাট বাঁধতে শুরু করে। রক্তনালির পথ বন্ধ হয়ে ঘটায় হার্ট অ্যাটাক। বিষণ্ন মনের লোকদেরই রক্তনালিতে মন্দ কোলেস্টেরল বেশি জমে। তাই প্রফুল্ল মন নিয়ে থাকা ভালো।

ঝেড়ে ফেলুন দুশ্চিন্তা
দুশ্চিন্তা বেশি হলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়বেই। অযথা দুশ্চিন্তার কোনো মানেই হয় না। এই চাপ আর দুশ্চিন্তায় বেড়ে যায় অ্যাড্রেনালিন হরমোন। অন্যান্য হরমোনও। বেড়ে যায় হূৎস্পন্দন। রক্তচাপ বাড়ে। রক্তে বাড়ে চর্বিকণা। যতবার বাড়ে রক্তচাপ, ততই হার্টের রক্ত ধমনির গায়ে পড়ে চর্বির আস্তরণ। হার্টের মাংসপেশিতে হয় রক্তের অভাব। তৈরি হয় কোলেস্টেরল। জমে ধমনির গায়ে। হার্টের রক্তনালি বন্ধ। ঘটে হার্ট অ্যাটাক। তাই দুশ্চিন্তা কমিয়ে ফেলুন। সম্ভব হলে একদম নয়।

রাগ নয় একদম
রাগ হূদ্যন্ত্রের মারাত্মক শত্রু। অল্পস্বল্প রাগ করুন। কিংবা রাগ পুষে না রেখে সরাসরি প্রকাশ করুন। ভালো। কিন্তু প্রচণ্ড রাগ শুধু হার্টকেই নাড়া দেয় না, রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াতেও প্রভাব ফেলে। রক্তনালিগুলো সংকুচিত হয়। দেহে রক্তপ্রবাহ কমে যায়। এমনকি মস্তিষ্কের, হূৎপিণ্ডে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। হঠাৎ রেগে দেখুন। শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে যাবে। হার্টবিট বেড়ে যাবে। রক্তচাপ বাড়বে। চোখের মণি বড় হবে। সঙ্গে রক্তে শর্করা বেড়ে যাবে। হজম কমে যাবে। অন্যান্য অঙ্গের রক্ত চলে আসে রক্তনালি দিয়েই কেন্দ্রীয় স্মায়ু, পেশি ও হার্টে। মস্তিস্ক থেকে সংকেত দেবে হরমোন নিঃসরণে। নাম ‘নর-অ্যাড্রেনালিন’। রক্তে বেড়ে যাবে চর্বি থেকে ফ্যাটি এসিড। রক্তনালির গায়ে আস্তরণ ফেলে ধমনির পথ সরু হবে। রক্ত জমাট বেঁধেই ঘটে অক্সিজেনের অভাব। এরপর হার্ট অ্যাটাক। তাই রাগ ভালো না। রাগ আর দুশ্চিন্তা মিলে হূদয়ের ছন্দে ঘটে অনিয়ম। সৃষ্টি হয় নেতিবাচক আবেগ। তাই আবেগগুলো দমন করতেই হবে বা সংযত করতে হবে। বিশেষজ্ঞের মতে, যেসব আবেগ হূদরোগের সঙ্গে জড়িত, তা দূর করা যায় অন্যান্য মানুষের সঙ্গে কথা বলে, হাসিখুশিতে। প্রয়োজনে জীবনসঙ্গীর সঙ্গে। কথা বলুন মন খুলে। বিশ্বাস করুন সহজে। দেখবেন আপনার জীবনসঙ্গী হূদয় খুলে দেবে অকাতরে। তা না হলে হূদয়ে ঘটবে তোলপাড়। ততই ধরা পড়বে হার্টের পাগলামি। কখনো দেখবেন, কিছু হূদরোগী বা হূদরোগপ্রবণ লোক হাসেও না, কাঁদেও না। কেমন জানি মুখ ভার। যেন ‘ক্লেশগ্রস্ত মানুষ’। কোনো ধরনের আবেদন সহ্য হয় না। হাসে না। যেন হাসতে তাদের মানা। সারাক্ষণ ভ্রূ কুঁচকে থাকে। কাজেকর্মে সারাক্ষণ অভিযোগ। রাগ রাগ ভাব। যেন নিরাপত্তার অভাব। তাতে স্ট্রেস হরমোন বেড়েই চলে। এই দুশ্চিন্তা, পীড়ন, নানা বিপত্তি, আবেগ আটকে রাখা সবই বাড়িয়ে দেয় রক্তচাপ। যদি প্রতিদিন এসব ঘটতেই থাকে, হয়ে ওঠে ক্ষতিকর।

আন্তরিক হোন যথেষ্ট
যতই থাকুক হূদরোগের ঝুঁকি, সহজ পথেই তা দূর করা যায় বা হওয়ার আগেই রোধ করা যায়। বাড়িয়ে দিন সাহায্যের হাত। কাজ করুন মানুষের জন্য। প্রয়োজনে কোনো প্রতিষ্ঠানে। মিশে যান শিশুদের মধ্যে। খোলামেলা কথা বলুন। নিঃসঙ্গ আত্মীয়ের সঙ্গে সময় কাটান কথা বলে। ছোট ছেলেমেয়েদের কাছে নিয়ে বসে বই থেকে পড়ান, গল্প বলুন। এতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। হূদয় সতেজ হবে। যদি চাকরি থেকে অবসর নেন, বেড়ে যায় আরও মানসিক চাহিদা। ফুরফুরে মন নিয়ে বাগান করুন। নতুন ভাষা শিখুন। কম্পিউটারে হাত দিন। স্মৃতিচারণা করুন, আত্মকথা লিখুন। বিকেলে বেড়াতে যান। একটু শরীরচর্চাও ভালো। সবার সঙ্গে মজা করে কথা বলুন। হাসুন। বন্ধুদের সঙ্গে খেলুন, পিকনিকে যান। মেলা থেকে ঘুরে আসুন। বেশি করে মেলামেশা করুন। আরও আনন্দ পাবেন। কথা বলবেন খোলা আকাশের মতো। আবার অন্যের কথাও শুনবেন কিন্তু বিরক্ত না হয়ে, দাঁতে দাঁত না চেপে। শুনুন হেসে হেসে। যদি মনে দানা বাঁধতে চায় রাগ, শত্রুতা, বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা−ভেঙে গুঁড়িয়ে দিন মন থেকে। জীবনে একা না থেকে সময়ে বেছে নিন ভালো জীবনসঙ্গী। সে হবে আপনার প্রকৃত বন্ধু। একসময় ঘরে আসবে নতুন শিশু। যারা হবে জীবনের আরেক শক্তি, হবে অবলম্বন। সবাইকে নিয়েই বাঁচতে শিখতে হবে। মনটাকে সারাক্ষণ রাখুন খোলা আকাশের মতো। দেখবেন হূদরোগের ঝুঁকি কমে হূদয় ভরে যাবে ফুলের সৌরভে।

সূত্রঃ প্রথম আলো- জুলাই, ২০০৯